পাঁচ বছর পর ভয়ানক রূপে ফিরল হাম
হামের প্রাদুর্ভাব দেশজুড়ে উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বর্তমানে শয্যার চেয়ে হামের রোগীর সংখ্যা বেশি। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক রোগীকে করিডোর ও হাসপাতালের বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল পর্যন্ত হাসপাতালটিতে রোগী ভর্তি ছিল দেড়শর বেশি। তাদের মধ্যে প্রায় ১৩০ জনই হাম আক্রান্ত, যার বড় অংশই শিশু। আইসিইউতে দায়িত্বে থাকা সেবিকা মাহমুদা আক্তার বলেন, ঈদের পর থেকেই রোগীর চাপ বেড়েছে। এখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, সেখানকার শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগীর বড় অংশই হামে আক্রান্ত। ফলে তাদের মূল চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ জানিয়েছে, ঢাকায় সংক্রমণ বেশি হলেও রাজশাহী ও ময়মনসিংহের রোগী পাওয়া যাচ্ছে। চলতি বছরের শুরু থেকেই সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। তবে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, এই প্রাদুর্ভাব কি অপ্রত্যাশিত ছিল, নাকি প্রস্তুতির ঘাটতির ফল? স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রতি পাঁচ বছর পরপর হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। অতীতে এ সময় বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হলেও গত বছর সেটি হয়নি। ফলে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘শিশুদের মধ্যে এখন প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। আগে তারা মায়ের কাছ থেকে কিছু সুরক্ষা পেত, কিন্তু এখন সেই সুরক্ষাও কমে এসেছে। একই সঙ্গে টিকার কার্যকারিতা সময়ের সঙ্গে কমে যাওয়ায় সংক্রমণ ছড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রাখা কঠিন। উপজেলা থেকে মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত সব পর্যায়ে হামের জন্য পৃথক ওয়ার্ড চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে দ্রুত চিকিৎসা নির্দেশিকা (গাইড লাইন) প্রণয়ন ও চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন এই বিশেষজ্ঞ।’
এদিকে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধি। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এই বয়সে শিশুদের টিকা নেওয়ার কথা নয়। অথচ টিকা পাওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে, এটি বড় উদ্বেগের বিষয়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, একচেটিয়া বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়া, অপুষ্টি এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে শিশুদের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি ঈদের সময় মানুষের ব্যাপক যাতায়াত সংক্রমণ বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মোহাম্মদ মঈনুল আহসান জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালে হামের জন্য পৃথক ওয়ার্ড চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ডিএনসিসি হাসপাতালের সব নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) প্রস্তুত রাখতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এসব নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘শুধু টিকা দিলেই হবে না, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রাখা এবং দরিদ্র পরিবারগুলোকে সহায়তা না দিলে সংক্রমণ থামানো কঠিন হয়ে পড়বে।’
তার ভাষ্য, ‘বিগত অন্তর্বর্তী সরকার কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ করে দেওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সামনে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। তাদের খামখেয়ালির কারণে শুধু হাম নয়, যেসব সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের পথে ছিল, সেগুলোও ফিরে আসতে শুরু করবে।’
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে এটি মহামারি আকার নিতে পারে। তিনি জানান, হামের টিকা সংগ্রহে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, সংক্রমণ যখন ছড়িয়ে পড়েছে, তখন নেওয়া এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে? নাকি আগেভাগে প্রস্তুতি না নেওয়ার খেসারতই এখন দিচ্ছে স্বাস্থ্য খাত ও দেশের জনগণ?