
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু শব্দ আছে, যেগুলো বছরের পর বছর ধরে সত্যকে আড়াল করতে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কলঙ্কিত করতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ‘বিভেদপন্থী’ তার মধ্যে অন্যতম। ১৯৮৩ সালের রক্তক্ষয়ী ‘লাম্বা-বাদী’ গৃহযুদ্ধের পর থেকে এই শব্দটি এত ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছে যে, অনেকেই আজ আর প্রশ্ন তোলেন না- আসলে বিভেদের সূচনা কোথা থেকে হয়েছিল? কে প্রথম সংগঠনের অভ্যন্তরে অনৈক্যের বীজ বপন করেছিল? কে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ভিত নষ্ট করার পথ তৈরি করেছিল?
গৃহযুদ্ধের নেপথ্যের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের ২১ আগস্ট সন্তু লারমা ও ভবতোষ দেওয়ান আগরতলা হয়ে দিল্লিতে যান এবং সেখানে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। সফর শেষে ১৯৭৫ সালের ৩০ আগস্ট তারা দেশে ফিরেন। ফেরার ক’দিনের মাথায় সন্তু লারমা ১৭ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির কুকিছড়ায় মূল সড়কের পাশের দোকানে পুলিশের হাতে নাটকীয়ভাবে ধরা পড়েন। নিরাপত্তার ব্যাপারে পূর্ব সতর্কীকরণ সত্ত্বেও এভাবে খাগড়াছড়ি-পানছড়ি মূল সড়কে পুলিশের নিকট ধরা পড়া নিয়ে তখন থেকেই শান্তিবাহিনীর উর্ধ্বতন মহলে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। কথিত আছে, প্রেমিকার সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যেই সন্তু লারমা বেপরোয়া হয়ে সংগঠনের সতর্কবাণী অগ্রাহ্য করে বিপদ ডেকে আনেন।
এরপর তিনি প্রায় ৫ বছর জেল খাটার পর স্বরাষ্ট্র সচিব বরাবর ৪৩ পৃষ্ঠার লিখিত শর্তের বিনিময়ে ১৯৮০ সালের ২২ জানুয়ারি মুক্তি পান। উক্ত শর্তনামাটি লারমার ভাষায় ‘সন্তু বেক উগুলি ইজচে’ মানে ‘সন্তু সব ফাঁস করে ফেলেছে’।
যাইহোক, মুক্তি পাওয়ার পর পার্টির নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো রূপ যোগাযোগ না করে, কোনো আলাপ-আলোচনা ব্যতিরেকে রাঙামাটিতে শ্বশুর বাড়িতে বসে সন্তু লারমা নিজে একটি কেন্দ্র স্থাপন করে বসেন। সেখান থেকে শান্তিবাহিনীর জোন কমান্ডারদের উদ্দেশ্যে এভাবে চিঠি লিখতেন-
“আমি ফিরে এসেছি, কারও ভয় পাওয়ার নেই। যারা এতদিন লুকিয়ে রয়েছেন এবং হাটে-বাজারে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন, তারা বাইরে এসে পড়ুন। কোনো কিছু হলে আমি প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা করে দেব।”
তাঁর এই চিঠিগুলো জোন কমান্ডাররা তৎকালীন শান্তিবাহিনীর হেডকোয়ার্টার ‘বাত্তি’-তে এম.এন. লারমার কাছে পাঠিয়ে দিতেন। সন্তু লারমার এই চিঠি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এম.এন. লারমা বলে উঠেছিলেন-
“আমাদের সঙ্গে কোনো রূপ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা না করে সন্তু কি পাল্টা প্রশাসন খাড়া করে আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি ঠেকিয়ে দিতে এসব শুরু করে দিয়েছে? এটা সন্তুর ব্যক্তিগত আলাদা প্রশাসন। এটা বন্ধ করা জরুরি।”
জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সন্তু লারমার এ ধরনের কর্মকাণ্ডে খোদ মানবেন্দ্র লারমাও ত্যক্ত বিরক্ত হয়েছিলেন বোঝা যায়। আন্দোলনের মূল নেতৃত্বকে পাশ কাটিয়ে রাঙ্গামাটির শ্বশুরবাড়িতে বসে এভাবে মাঠ কর্মীদের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা, নির্দেশনা দান, হাটে-বাজারে প্রকাশ্যে ঘুরার আহ্বান ও তাদের নিরাপত্তা দানের আশ্বাস দেওয়ার সাধ্য কার আছে? যদি না তার সাথে সরকার-সেনাবাহিনীর সাথে বোঝাপড়া না থাকে।
স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অগ্রাহ্য করে সমান্তরাল নির্দেশনা দান ও আনুগত্যের ক্ষেত্র তৈরি করাকে যদি “বিভেদপন্থা” বলা না যায়, তাহলে “বিভেদপন্থার” সংজ্ঞা আসলে কী?
১৯৮৩ সালের ১৪ জুন প্রীতিগ্রুপের ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়ে বলী ওস্তাদসহ তিন যোদ্ধাকে হত্যার মধ্য দিয়ে শান্তিবাহিনী (জনসংহতি সমিতি) চূড়ান্তভাবে বিভক্ত হয়। এই বিভেদমূলক কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল রাঙ্গামাটিতে সন্তু লারমার শ্বশুরবাড়িতে এবং তা পরিণত রূপ নিয়েছিল ১৪ জুন ১৯৮৩ সালে।
প্রীতিগ্রুপকে ‘বিভেদপন্থী’ বলে গালমন্দ করা হলেও আসলে সন্তু লারমাই হলেন আসল ‘বিভেদপন্থী’। জীবনের ছায়াহ্নে এসেও তিনি তার বিভেদমূলক আপত্তিকর কর্মকাণ্ড পরিত্যাগ করতে পারেননি। দীঘিনালায় শিক্ষক থাকাকালেও ছাত্রদের মাঝেও তিনি বিভেদ সৃষ্টি করেছিলেন। সন্তু লারমার ছাত্র দেবজ্যোতি চাকমা (দেবেন) শিক্ষকের এ ধরনের আচরণ মেনে নিতে পারেননি। দেবজ্যোতিদের উদ্যোগ ভেস্তে দিতে সন্তু লারমা মদদ দিয়ে ছাত্রদের নিয়ে একটি চক্র গড়ে তুলেছিলেন। এমনও অভিযোগ রয়েছে, ‘লারমা’ গোত্রের শিক্ষার্থীদের প্রতি তার ছিল বিশেষ খাতির।
শান্তিবাহিনীতে থাকাকালে এবং চুক্তি ও সারেন্ডারের পরও তিনি বিভেদপন্থার আশ্রয় নিয়ে পাহাড়ে অশান্তির আগুন জ্বালিয়েছেন। সে আগুনে জ্বলে পুড়ে ছাড়খার হচ্ছে পাহাড়ের জনগণ।
যাই হোক, এম.এন. লারমার অবস্থান সংগঠনের ঐক্য রক্ষার পক্ষে হলেও দুঃখজনকভাবে তিনি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে আন্দোলনের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলতে হবে। তিনি যদি দলীয় নীতি ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা মোতাবেক পার্টির ভেতরে উদ্ভূত দ্বন্দ্বকে বিচক্ষণতার সঙ্গে যথাযথভাবে মীমাংসা করতে পারতেন, তাহলে একটি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঐতিহাসিক ক্ষেত্র তৈরি হতো। আর তখনই তিনি একজন অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে অমর হয়ে থাকতেন।
কাজেই ইতিহাসকে নির্মোহভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গৃহযুদ্ধের আসল বিভেদপন্থার হোতা হলেন সন্তু লারমা। তিনিই জেলবন্দি থেকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পাওয়ার পর পর সরকারের প্রেসক্রিপশনে যে পাল্টা প্রশাসন দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন, সেখানেই বিভেদপন্থার বীজ নিহিত ছিল। এম.এন. লারমা তাঁর আপন ভাই না হলে, সন্তু লারমার এমন পার্টিবিরোধী কার্যকলাপের কারণে নিশ্চয়ই তাঁকে মঞ্জুআদামে “সংবর্ধনা” দেওয়ার পরিবর্তে “গোপনীয়তা ফাঁস” ও “দলীয় শৃঙ্খলা লংঘনের” দায়ে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণাও করা হতে পারত।
সূত্র: মাইকেল চাকমার ফেসবুক।