
রাঙামাটির জুম্ম নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এক গভীর পর্যালোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন - সন্তু লারমাকে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসর থেকে সম্পূর্ণভাবে বর্জনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। ফলে সন্তু লারমা একঘরে হয়ে পড়েছেন। এটি কোনো ক্ষণিক আবেগ, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ কিংবা হঠকারী প্রতিক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে জাতিস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড, অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং রাজনৈতিক প্রতারণার বিরুদ্ধে সঞ্চিত ক্ষোভ ও বোধের সুসংহত অভিব্যক্তি।
বক্তাদের মতে, রাঙামাটিতে বহু বছর ধরে যে জাতিগত স্বার্থবিরোধী প্রবণতা ক্রমাগত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে, তার অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সুবিধাভোগী সন্তু লারমা নিজেই। স্থানীয় জুম্ম ব্যবসায়ীদের প্রান্তিক করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ-সুবিধা বহিরাগত সেটেলার গোষ্ঠীর হাতে অর্পণের মাধ্যমে তিনি কার্যত একটি বৈষম্যমূলক ক্ষমতা কাঠামোকে শক্তিশালী করেছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন আত্মবিরোধী ভূমিকার নজির অত্যন্ত বিরল, যেখানে জাতির মুক্তি ও অধিকারের শপথ গ্রহণকারী একজন নেতা শেষ পর্যন্ত জাতির অস্তিত্ব সংকটের অন্যতম অনুঘটকে পরিণত হন। সন্তু লারমা আজ সেই বিতর্কিত ভূমিকাতেই অবতীর্ণ। রাঙামাটিকে ক্রমশ সেটেলার-প্রভাবিত জনবিন্যাসে রূপান্তরের যে প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে অগ্রসর হচ্ছে, তার নেপথ্যে তাঁর প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আজ জনপরিসরে বহুল আলোচিত।
ঠিকাদারি, বাণিজ্য, উন্নয়ন প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে জুম্ম জনগোষ্ঠীকে ক্রমাগত সরিয়ে দিয়ে বহিরাগতদের জন্য সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত করা হয়েছে। ফলস্বরূপ, পূর্বপুরুষের ভূমিতে বসবাসকারী জুম্ম জনগণ দিন দিন অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব, সামাজিকভাবে প্রান্তিক এবং রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছেন। এটি কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্ন নয়; বরং এক ধরনের নীরব স্থানচ্যুতি ও অস্তিত্ব সংকটের বহুমাত্রিক বাস্তবতা।
সন্তু লারমা বহুবার ঘোষণা করেছেন যে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনি “শ্মশানে পরিণত” করে যাবেন। কিন্তু সেই ঘোষণার নৈতিক ভিত্তি কোথায়? যে ব্যক্তি একটি জাতির ভবিষ্যৎকে ধ্বংসের প্রতীকে উপস্থাপন করেন, তিনি নিজে এবং তাঁর পরিবার কোথায় অবস্থান করছেন? তাঁর স্ত্রী, কন্যা ও উত্তরসূরিরা নিরাপদ পরিবেশে, আর্থিক নিশ্চয়তার বলয়ে এবং বিদেশে সুরক্ষিত জীবনযাপন করছেন। বিপুল সম্পদ ও প্রভাবের নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ করে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে কোনো সংকট তাঁর নিজ পরিবারকে স্পর্শ করবে না। ফলে তাঁর উচ্চারিত ত্যাগ, সংগ্রাম কিংবা আত্মবলিদানের ভাষ্য আজ গভীর প্রশ্নের মুখোমুখি।
আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত থেকে তিনি যে রাজনৈতিক অবস্থান ধারণ করেছেন, নাগরিক সমাজের মতে তা মূলত এক দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রতারণার রূপ নিয়েছে। জনগণের আবেগ, আত্মত্যাগ এবং সংগ্রামের ইতিহাসকে পুঁজি করে ক্ষমতার কেন্দ্র ধরে রাখার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থকে ক্রমাগত আপসের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এদিকে সাধারণ জুম্ম জনগণ ভূমিহীন, কর্মহীন ও অধিকারবঞ্চিত হয়ে পড়লেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কখনোই প্রশ্নের মুখে পড়েনি।
রাঙামাটির জুম্ম সমাজের জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকরা সন্তু লারমাকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে একঘরে করার যে অবস্থান গ্রহণ করেছেন, তা তাঁদের বিবেচনায় সময়োপযোগী ও অনিবার্য পদক্ষেপ। তাঁদের বিশ্বাস, জাতির অস্তিত্ব, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ রক্ষার স্বার্থে এখনই সত্যকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে।
যে ব্যক্তি নিজের পরিবারকে নিরাপত্তার বলয়ে রেখে সমগ্র জাতির সামনে ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করেন, তিনি নেতৃত্বের নৈতিক মর্যাদা ধারণ করতে পারেন না। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে জুম্ম জনগণকে তাই আরও সতর্ক, আরও ঐক্যবদ্ধ এবং আরও আত্মসচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার আত্মমর্যাদা, প্রজ্ঞা এবং ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের শক্তি দ্বারা - ভয়, বিভ্রান্তি কিংবা আত্মসমর্পণের মাধ্যমে নয়।