– লেখা: মাইকেল চাকমা
গত ১৪ জুন `বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ‘ (পিসিপি) কর্তৃক আয়োজিত অনলাইন আলোচনা সভায় ১৯৮৩ সালের গৃহযুদ্ধ প্রসঙ্গে আমার বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করছি। এসব প্রতিক্রিয়ার অধিকাংশই স্বাভাবিকভাবেই জেএসএস-ঘরানার রাজনৈতিক অবস্থান থেকে এসেছে। এছাড়া কিছু প্রতিক্রিয়া এসেছে প্রয়াত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার রাজনৈতিক দর্শন ও ব্যক্তিগত অবদানের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকেও।
প্রতিক্রিয়া থাকা স্বাভাবিক। কারণ ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনা নয়; ইতিহাস হলো স্মৃতি, ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং ক্ষমতার বয়ানেরও একটি ক্ষেত্র। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত, আন্দোলন ও আত্মত্যাগের ইতিহাসে কোনো ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা পুনরালোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করা মানেই প্রতিষ্ঠিত ধারণাগুলোর মুখোমুখি হওয়া।
১৯৮৩ সালের ঘটনাপ্রবাহ পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাবিধুর অধ্যায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সময়ের প্রবাহে সেই অধ্যায়ের অনেক দিক আজ বিস্মৃতপ্রায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘদিন ধরে এ ঘটনাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের বহুমাত্রিক সত্য নয়, বরং একটি একমুখী বয়ানই অধিক পরিচিত হয়ে উঠেছে।
১৪ জুনের আলোচনার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে হেয় করা ছিল না। বরং উদ্দেশ্য ছিল ইতিহাসের এমন একটি অধ্যায়কে পুনরায় আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মুক্ত ও সমালোচনামূলক পর্যালোচনার সুযোগ সীমিত ছিল। ইতিহাসের প্রতি প্রকৃত দায়বদ্ধতা কখনো অন্ধ আনুগত্যে নয়; বরং প্রশ্ন, অনুসন্ধান এবং তথ্য-উপাত্তের আলোকে পুনর্মূল্যায়নের মধ্যেই নিহিত থাকে।
সেদিনের আলোচনা নিঃসন্দেহে `পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সিমিতি‘ (পিসিজেএসএস) কর্তৃক প্রচারিত একপাক্ষিক ইতিহাসের বৃত্তের বাইরে এসে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ইতিহাসকে পুনঃপাঠের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা জানার ও উদ্ঘাটনের আগ্রহ জাগিয়ে তুলেছে। তাই, যান্ত্রিক যুগে ইন্টারনেটের দুনিয়ায় বুঁদ হয়ে থাকা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যদি এর মাধ্যমে কিছুটা হলেও ইতিহাসপাঠ ও অনুসন্ধানের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা যায়, সেখানেই আলোচনার সার্থকতা বলে আমি মনে করি।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ইতিহাসকে যত বেশি পাঠ করা হবে, তত বেশি নতুন প্রশ্নের জন্ম হবে। আর প্রশ্নের জন্ম হওয়া মানেই ইতিহাস বিকৃত করা নয়; বরং ইতিহাসকে আরও গভীরভাবে বোঝার পথ উন্মুক্ত করা। যে জাতি বা জনগোষ্ঠী নিজের ইতিহাসকে প্রশ্ন করার সাহস হারিয়ে ফেলে, তারা একসময় ইতিহাসচর্চার পরিবর্তে ইতিহাস-উপাসনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু ইতিহাসের কাজ উপাসনার বিষয় হওয়া নয়; ইতিহাসের কাজ হলো সত্যের অনুসন্ধান।
আমি লক্ষ্য করেছি, আমার বক্তব্যের পর যেসব প্রতিক্রিয়া এসেছে, তার অধিকাংশই ক্ষোভ ও আবেগনির্ভর। এটি অস্বাভাবিক নয়, কারণ ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের আত্মপরিচয়, বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক অবস্থান জড়িয়ে থাকে। কিন্তু একটি বিষয় আমাকে ভাবায়- খুব কম ক্ষেত্রেই আমি তথ্য, যুক্তি ও দলিলভিত্তিক সমালোচনা দেখতে পেয়েছি। অথচ একটি বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হলো তথ্য দিয়ে তার ভুল প্রমাণ করা, পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করা এবং বিকল্প ব্যাখ্যা হাজির করা।
সত্যকে কখনো গালাগালি দিয়ে পরাজিত করা যায় না। ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা আবেগঘন প্রতিক্রিয়া সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু তা কোনো ঐতিহাসিক বিতর্কের নিষ্পত্তি ঘটায় না। বরং এসব আচরণ অনেক সময় প্রকৃত আলোচনাকে আড়াল করে দেয়। আমি বরং কৃতজ্ঞ থাকব তাঁদের প্রতি, যারা আমার বক্তব্যের দুর্বলতা, তথ্যগত সীমাবদ্ধতা বা বিশ্লেষণগত ত্রুটি চিহ্নিত করে তা দলিল-প্রমাণসহ উপস্থাপন করবেন। কারণ সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্যের চেয়ে অনেক বড় বিষয়।
কেউ কেউ আমাকে আরও অধ্যয়ন করার পরামর্শও দিয়েছেন! আমি তাঁদের বক্তব্যকে ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করি। কারণ একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার ইতিহাস শেখার কোনো শেষ নেই। তবে একই সঙ্গে তাঁদের কাছেও আমার বিনীত আহ্বান থাকবে- যাঁদের কাছে নতুন তথ্য, দলিল, স্মৃতিকথা কিংবা প্রামাণ্য নথি রয়েছে, তাঁরা যেন সেগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরেন। ইতিহাসকে শক্তিশালী করে গোপনীয়তা নয়, বরং উন্মুক্ত গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক। সাথে আরো বলতে চাই- আপনাদের অন্যকে উপদেশ দেওয়ার পাশাপাশি নিজের অর্জিত জ্ঞানের গভীরতাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ জ্ঞানীরা বলেছেন- যিনি নিজের সম্বন্ধে জানেন না, তিনিই সবচেয়ে বড় মূর্খ।
আমি মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস কোনো একক ব্যক্তি, দল বা সংগঠনের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়। এটি সমগ্র জনগণের ইতিহাস। এই ইতিহাসে যেমন গৌরব রয়েছে, তেমনি রয়েছে ভুল, বিভাজন, সংকট এবং আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয় অধ্যায়ও। ইতিহাসের প্রতি সত্যিকার সম্মান দেখাতে হলে আমাদের সবকিছুকেই সমান সাহসের সঙ্গে আলোচনায় আনতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, ১৯৮৩ সালের ঘটনাবলি নিয়ে আলোচনা এখানেই শেষ নয়। ইতিহাসের বহু অজানা দলিল, বহু অনুচ্চারিত সাক্ষ্য এবং বহু অপ্রকাশিত তথ্য এখনও আলোচনার অপেক্ষায় রয়েছে। তাই যাঁদের কাছে প্রাসঙ্গিক নথি ও তথ্য রয়েছে, তাঁদেরও প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানাই। কারণ ইতিহাসের আদালতে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি নয়, আবেগ নয়, দল নয়- টিকে থাকে কেবল তথ্য, দলিল এবং সত্য।
আমাদের সকলের দায়িত্ব হওয়া উচিত ইতিহাসের কোনো একক ব্যাখ্যার বন্দি না হয়ে, প্রকৃত ইতিহাসকে জানা এবং তা ধারণ করা । বস্তুনিষ্ঠতা, যুক্তিবোধ এবং সত্য অনুসন্ধানের মানসিকতাই পারে আমাদের অতীতকে আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে এবং ভবিষ্যৎকে আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর নির্মাণ করতে।
“সূত্র: মাইকেল চাকমার ফেসবুক।