খাগড়াছড়ির কমলছড়িতে পাহাড়িদের ওপর সেটলার হামলার প্রতিবাদে রামগড়ে বিক্ষোভ ও সমাবেশ
“পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বেদখল বন্ধ কর”—এই শ্লোগানকে সামনে রেখে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার কমলছড়িতে পাহাড়িদের ওপর সেটলার বাঙালিদের হামলার প্রতিবাদে রামগড়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গতকাল রবিবার (১৮ জানুয়ারি) বিকাল ৩টার দিকে রামগড় উপজেলায় পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের উদ্যোগে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়।
মিছিলটি লাচারী পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সীমান্ত সড়ক প্রদক্ষিণ করে পিলাট ঘাট এলাকায় গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়। এতে এলাকার সচেতন শিক্ষার্থী, যুবক, নারীসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
সমাবেশে সঞ্চালনায় ছিলেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের রামগড় উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ধন মোহন ত্রিপুরা। সভাপতিত্ব করেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের রামগড় উপজেলা শাখার সভাপতি ধনু ত্রিপুরা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সভাপতি তৈমাং ত্রিপুরা এবং ডি ওয়াইফাই কেন্দ্রীয় সদস্য সুইচিং মারমা।
সমাবেশে ধন মোহন ত্রিপুরা বলেন,
শান্তির কথা বলা হলেও বাস্তবে পাহাড়ে নিপীড়ন, হামলা ও উচ্ছেদ বেড়েই চলেছে। কমলছড়ির ঘটনা প্রমাণ করছে পাহাড়িরা আজও নিরাপদ নয়। ভূমি কমিশন কার্যকর করা, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন এবং পাহাড়ি জনগণের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সভাপতি তৈমাং ত্রিপুরা বলেন,
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব, পরিচয় ও সংস্কৃতি এই পাহাড়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। ভূমি শুধুমাত্র মাটি নয়—এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, আত্মসম্মান এবং ভবিষ্যৎ। যুগের পর যুগ ধরে পাহাড়ি জনগণ এই পাহাড়, এই বন, এই নদীর সঙ্গে মিলেমিশে বেঁচে এসেছে। কিন্তু আজ পরিকল্পিতভাবে আমাদের ভূমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এবং পাহাড়ি জনগণকে দমন করার চেষ্টা চলছে। কমলছড়িতে সংঘটিত হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি পাহাড়ি শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজকে ভয় দেখানোর পরিকল্পিত প্ররোচনা। পাহাড়ি ছাত্র সমাজ কখনো ভয় পায়নি, আজও পাবে না।
বিএনপি বর্তমানে ক্ষমতায় না থাকলেও পাহাড়ে ভূমি দখল, উসকানি ও বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং অশান্তির রাজনীতি চলছে। এই অস্থিতিশীলতার পেছনে বিএনপির মাঠরাজনীতি, সংগঠিত অপতৎপরতা ও পরিকল্পিত উসকানি স্পষ্ট। ক্ষমতায় না থাকার যুক্তি দিয়ে তারা দায় এড়াতে পারবে না। পাহাড়ের মানুষ ভালো জানে, কীভাবে অন্যায় চালানো হচ্ছে এবং কে তা পরিচালনা করছে। পাহাড়ি ছাত্র সমাজ স্পষ্টভাবে বলছে—ভূমি দখলের রাজনীতি, নিপীড়ন ও বিভ্রান্তিকর কার্যক্রম কখনো চলতে দেওয়া হবে না। আমরা চাই পাহাড়ে শান্তি, ন্যায়ভিত্তিক সহাবস্থান এবং পাহাড়ি জনগণের নিরাপদ পরিবেশ।
গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য সুইচিং মারমা বলেন,
উন্নয়নের নামে দখলদারিত্ব পাহাড়িরা কখনো মেনে নেবে না। সেটলার পুনর্বাসনের নামে পাহাড়িদের উচ্ছেদ মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। ২০২৩ সালের অগ্নিসংযোগের ঘটনাসহ লামার ম্রোং জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত দমন-নিপীড়নের বাস্তব চিত্র প্রমাণ করছে—যেখানে প্রকৃত দোষীদের আড়াল করে পাহাড়িদের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এই ধরনের রাজনৈতিক মদদপুষ্ট দখল, উচ্ছেদ ও সহিংসতা বন্ধ না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে ন্যায়ভিত্তিক শান্তি সম্ভব নয়। পাহাড়ি জনগণ তাদের ভূমি ও অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
সভাপতিত্ব বক্তব্যে ধনু ত্রিপুরা বলেন,
পার্বত্য চট্টগ্রাম কোনো দয়ার জায়গা নয়—এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পৈতৃক ভূমি। রাষ্ট্রীয় মদদে পরিকল্পিতভাবে ভূমি বেদখল ও সেটলার পুনর্বাসনের মাধ্যমে পাহাড়িদের নিজ ভূমি থেকে উৎখাত করা হচ্ছে। কমলছড়ির হামলা বিচ্ছিন্ন নয়, এটি দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক ও ভূমি দখলের ফল। আমরা অবিলম্বে হামলার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
সমাবেশ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং প্রকাশ করা হয় তিনটি মূল দাবি:
কমলছড়িতে পাহাড়িদের ওপর হামলায় জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বেদখল ও সেটলার পুনর্বাসন বন্ধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন।
পাহাড়ি জনগণের নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা।