লেখা: অমল ত্রিপুরা, সাবেক সভাপতি, পিসিপি

একজন মা তাঁর অনাগত সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য কত স্বপ্ন বুকে লালন করেন! প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তে তিনি নিজের চেয়ে বেশি ভাবেন গর্ভে থাকা শিশুটির কথা। সন্তানটি যেন সুস্থভাবে জন্ম নেয়, যেন নিরাপদে পৃথিবীর মুখ দেখে—এই আশাতেই তিনি নিজের কষ্ট, ভয় ও অনিশ্চয়তাকে উপেক্ষা করে পথ চলেন।

সুমন্তি চাকমাও ছিলেন তেমনই একজন মা।গত শনিবার (১৮ জুলাই ২০২৬) সকাল ১০টার দিকে তিনি সাজেক থেকে সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশাযোগে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে যাচ্ছিলেন প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে। দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে তিনি ছুটছিলেন শুধু এই আশায়—তাঁর অনাগত সন্তান যেন সুস্থভাবে জন্ম নিতে পারে।

কিন্তু মাচলং ১৪ কিলোমিটার এলাকায় পৌঁছানোর পর এক নির্মম ঘটনার শিকার হন তিনি। বিজিবির একটি ডাম্প ট্রাক তাকে বহনকারী অটোরিকশাটিকে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর গর্ভে থাকা অনাগত শিশুটিও পৃথিবীর আলো দেখার আগেই নিভে যায়।

সাজেকের সুমন্তি চাকমার মৃত্যুর ঘটনা কেবলমাত্র একজন নারীর মৃত্যু নয়। এটি একসঙ্গে দুটি প্রাণের অবসান। একটি পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যু। একজন মায়ের ভবিষ্যৎ, একটি শিশুর সম্ভাবনা—সবকিছু এক মুহূর্তে শেষ হয়ে যাওয়ার মার্মান্তিক ঘটনা।

আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর (সুমন্তি) দাহক্রিয়ার সময় ধারণ করা একটি ছবি দেখলাম। সেখানে মায়ের গর্ভ থেকে মৃত শিশুটিকে বের করা হয়েছে। দৃশ্যটি হৃদয় বিদীর্ণ করার মতো। যে শিশুটি জন্মের পর মায়ের মুখ দেখার কথা ছিল, সে মায়ের নিথর দেহের সঙ্গেই বিদায় নিল। এর চেয়ে বেদনাদায়ক আর কী হতে পারে? এমন দৃশ্য কোনো সভ্য সমাজের মানুষকে নির্বিকার থাকতে দেয় না।

বিজিবির ট্রাকের ধাক্কায় সুমন্তি চাকমার মৃত্যুর এই ঘটনাটি দেশের অনেক মূলধারার সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে শুধু “ট্রাকের ধাক্কায় মৃত্যু” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই নিয়ে পাহাড়ের মানুষের নানান প্রশ্ন ও ক্ষোভ সামাজিক মাধ্যমে লক্ষ্য করছি। তা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়, সত্যকে মিথ্যা দিয়ে চাপিয়ে রাখতে চাইলে মানুষের ক্ষোভ জন্ম নেবেই তা স্বাভাবিক।

যেসব অনলাইন সংবাদমাধ্যমে বিজিবির ট্রাকের সম্পৃক্ততার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল, সেসব সংবাদ মাধ্যমের কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধু আমাকে জানিয়েছিলেন বিজিবিকে সম্পৃক্ত করে নিউজ করার জন্য তাদের সাথে বিজিবির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং ঘটনার সত্যতা বা প্রমাণ দেয়ার জন্য নাকি তাদেরকে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে!
গণমাধ্যমের প্রধান দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ ও সত্যনিষ্ঠ সংবাদ মানুষের সামনে তুলে ধরা। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে বহু ঘটনায় দেখা যায়, অভিযোগ অনুযায়ী অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আড়ালে থেকে যায় অথবা ঘটনাগুলো এমনভাবে উপস্থাপিত হয়, যাতে প্রকৃত চিত্রটি অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

সত্য প্রকাশের সাহসই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি। ক্ষমতাবান কিংবা প্রভাবশালী যে পক্ষই জড়িত থাকুক না কেন, গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো নির্ভয়ে তথ্য অনুসন্ধান করা এবং জনগণের সামনে সত্য তুলে ধরা। কারণ সত্য আড়াল করলে শুধু একটি ঘটনা নয়, ন্যায়বিচারের পথও আড়াল হয়ে যায়।

রাষ্ট্রের প্রতিটি বাহিনীর দায়িত্ব হলো জনগণের নিরাপত্তার দেয়া। তাদের কর্তৃক বা তাদের গাড়ি দিয়ে যদি কোন ঘটনা সংঘটিত হয়, তাহলে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও তদন্ত করে ঘটনার সত্যটা উদঘাটন করে জড়িতদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করাও রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।

আজ প্রশ্ন একটাই—
একজন মায়ের সঙ্গে তাঁর অনাগত শিশুর মৃত্যুর দায় কে নেবে? এই মৃত্যু কি কেবল দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া হবে? কয়েকদিনের আলোচনার পর কি এটি বিস্মৃত হবে? নাকি রাষ্ট্র প্রমাণ করবে যে প্রতিটি নাগরিকের জীবন—সে পাহাড়ের হোক কিংবা সমতলের—সমান মূল্যবান?

সুমন্তি চাকমার পরিবার নিশ্চয়ই শিশুটির জন্য এবং তার ভবিষ্যত নিয়ে হাজারো স্বপ্ন বুনেছিল। কিন্তু আজ সেই সব স্বপ্ন আগুনের শিখায় দগ্ধ হয়েছে। একটি মায়ের সঙ্গে একটি অনাগত ভবিষ্যৎও চিরবিদায় নিয়েছে।
আমরা সাজেকের ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করছি। যদি বিজিবির কোনো অবহেলা, আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে সুমন্তি চাকমার পরিবারের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। সিএনজিতে থাকা অন্যান্য আহত ব্যক্তিদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রয়াত সুমন্তি চাকমা এবং পৃথিবীর আলো দেখার আগেই ঝরে যাওয়া তাঁর অনাগত শিশুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

এই রাষ্ট্রের ক্ষমতাবান ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের প্রভাবে যেন ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা হারিয়ে না যায়। ধর্মীয়, জাতিগত পরিচয়ের ভিন্নতার কারণে যাতে কাউকে সুযোগ-সুবিধা ও ন্যায্যতা হতে বঞ্চিত করা না হয় এবং দূরে ঠেলে দেওয়া না হয় এই প্রত্যাশা রাখছি।

লেখাটি অমল ত্রিপুরার ফেসবুক থেকে সংগৃহিত।