খাগড়াছড়ির গুইমারার পাহাড়ি অধ্যুষিত রামেসু বাজারে সেনা-সেটলারদের বর্বরোচিত হামলা, অগ্নিসংযোগ ও তিন পাহাড়ি হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হতে চললেও মেলেনি কোনো বিচার। উল্টো এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের এক বছর পর ক্ষতস্থান ঢাকতে এবং নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে সেনাবাহিনী সেখানে কয়েকটি বাইরে চকচকে নামমাত্র টিনের খুপরি ঘর নির্মাণ করে আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর তা ঘটা করে উদ্বোধনের পাঁয়তারা চালাচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সেনাবাহিনীর এমন লোকদেখানো পুনর্বাসন প্রচেষ্টাকে ‘গরু মেরে জুতো দান’ এবং ভুক্তভোগীদের সাথে নিষ্ঠুর তামাশা বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় পাহাড়িরা।

২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গুইমারার পাহাড়ি অধ্যুষিত রামেসু বাজারে সেনা-সেটলাররা যৌথভাবে ব্যাপক হামলা চালায়। সেই হামলায় নির্বিচারে গুলি ও নির্যাতন চালিয়ে তিন পাহাড়ি যুবককে হত্যা করা হয়, আহত হন অর্ধশতাধিক এবং পাহাড়ি ব্যবসায়ীদের সম্পূর্ণ রামেসু বাজারসহ শতাধিক ঘরবাড়ি ও দোকানপাট পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। তৎকালীন হামলায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হলেও আজ পর্যন্ত হামলাকারী কিংবা জড়িত সেনা সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হামলার এক বছর পূর্তির প্রাক্কালে সম্প্রতি সেনাবাহিনী রামেসু বাজার এলাকায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কয়েকটি অত্যন্ত ছোট আকারের টিনের দোচালা ঘর (টিন ও কাঠের তৈরি সাধারণ স্টল) নির্মাণ করেছে। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর ঠিক যেদিনটিতে এই গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল সেদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে এসব ঘর উদ্বোধন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সেনা কর্তৃপক্ষ।

ঘটনা প্রসঙ্গে রামেসু বাজারের এক স্থানীয় পাহাড়ি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত বছর ২৮ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনী ও সেটলাররা মিলে আমাদের পাহাড়ি অধ্যুষিত পুরো বাজারটি পুড়িয়ে ছাই করে দিল, তিনজনকে নির্মমভাবে হত্যা করল। এক বছর ধরে সেই হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার হলো না, দোষীদের কাউকে ধরা হলো না। এখন ঠিক এক বছর পর সেই একই দিনে এসে তারা কয়েকটি ছোট খুপরি ঘর তুলে দিয়ে নিজেদের দায় এড়াতে চাইছে। এটা স্পষ্টতই ‘গরু মেরে জুতো দান’ ছাড়া আর কিছু নয়।

আরেক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী জানান, “আমাদের কোটি কোটি টাকার সম্পদ ও ব্যবসা পুড়িয়ে দিয়ে এখন এই নামমাত্র টিনের শেড তৈরি করে তারা বাইরের দুনিয়াকে দেখাতে চাইছে যেন তারা পাহাড়িদের পুনর্বাসন করছে। অথচ পাহাড়িদের মূল দাবি ছিল হামলা ও হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং স্থায়ী নিরাপত্তা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি জারি রেখে এমন লোকদেখানো ঘর তুলে আমাদের অপমান করা হচ্ছে।”
স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ি অধ্যুষিত রামেসু বাজার ধ্বংসের পেছনে যে সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য ছিল, তা ধামাচাপা দিতেই এ ধরনের আনুষ্ঠানিকতার আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। বিচার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত না করে রক্তাক্ত বর্বর ঘটনার বর্ষপূর্তির দিনেই এই উদ্বোধনকে স্থানীয়রা নিজেদের ক্ষতের ওপর নতুন করে লবণ ছিটানোর শামিল হিসেবে দেখছেন।