লেখা: অমল ত্রিপুরা
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জাতিসত্তাগুলোর অস্তিত্ব ধ্বংসের নীলনকশা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সুপরিকল্পিতভাবে সমতল থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদে নিয়োগ দিয়েছে। এই মন্ত্রণালয়ে প্রথমে রাঙামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ানকে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তিন মাসের মাথায় তিনি পদত্যাগ করেন। কথিত আছে, দীপেনকে সুকৌশলে অপসারণ করা হয়েছে। বর্তমানে সাচিং প্রু জেরিকে মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হলেও তিন পার্বত্য জেলার তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালকে। অপরদিকে, মন্ত্রী জেরীকে কক্সবাজার জেলায় তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বিএনপি সরকারের এহেন কর্মকাণ্ড নতুন কিছু নয়। এর শুরু হয়েছিল আশির দশকে জিয়াউর রহমানের শাসনামল থেকে। ব্যাপকভাবে সেনাবাহিনী মোতায়েন, সমতল থেকে সেটলার পাহাড়ে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে জনমিতির পরিবর্তন, পাহাড়িদের ন্যায্য আন্দোলনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে “ট্রাইবেল কনভেনশন’, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প গঠন করে দমন-পীড়ন বৃদ্ধি—ইত্যাদি তাঁর আমলেই হয়েছিল। তাঁর শাসনকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারই সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে।
১৯৭২ সালে শেখ মুজিব পাহাড়িদের ‘বাঙালি হয়ে যাওয়ার’ পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা তাঁর বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে এ দেশের বাঙালি ছাড়া অন্যান্য জাতিসত্তাসমূহের ওপর বাঙালি জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেন। ঠিক একইভাবে, বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রধান তারেক রহমানও পার্বত্য চট্টগ্রামে তাঁর বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন ও অসমাপ্ত কাজ বাস্তবায়নে নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। ইতোমধ্যে তিনি নিজে এবং উচ্চপর্যায়ের সরকারি আমলা, সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করে তিনটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছেন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই মীর হেলালকে মাঠে নামানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
তাঁকে দিয়ে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প উদ্বোধন করানো হচ্ছে। তিনি পাহাড়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এর মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষের কাছে মীর হেলালকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার একটি প্রক্রিয়া চলছে। অনেকটা গ্রামাঞ্চল বা বাজারে সাপুড়িয়া সাপের খেলা দেখানোর জন্য বীন বাজিয়ে লোক জড়ো করার মতো।
প্রশ্ন হচ্ছে—পাহাড়ের মানুষ এ বিষয়ে কতটুকু সচেতন?
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিএনপি সরকার একটি সুগভীর ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছে তা হলো পাহাড়িদের জাতিগতভাবে ধ্বংস করা এবং তাদের অধিকার ও আত্মমর্যাদায় আঘাত হানা। সরকারের এই সুগভীর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আমরা কতটা প্রস্তুত কিংবা সচেতন? বলতে গেলে আমাদের প্রস্তুতি খুবই অপ্রতুল। সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির ভুল রাজনীতির কারণে পাহাড়িদের মধ্যে অনৈক্য, দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে সমাজের মানুষের চিন্তা-চেতনায়ও পঁচন লক্ষ্য করছি। ফলে কয়েক মাস আগেও যে মীরকে ঘিরে ছিল কত প্রশ্ন, কত সমালোচনা, কত সংশয়—আজ সেই মীরই যেখানে যাচ্ছেন, সেখানে কেউ তাঁকে ফুলের মালা পরাচ্ছেন, কেউ তাঁকে বরণ করে নিচ্ছেন।
অধিকার ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে আমাদের পূর্বপুরুষরা কখনো কারও কাছে আপোষ করেননি। তেজস্বীনি কালিন্দী রানি ব্রিটিশ শাসক ক্যাপ্টেন লুইনকে তাঁর রাজদরবারে প্রবেশের অনুমতি দেননি। রুণু খাঁর মত বীরেরা শত্রুর কাছে নিজেকে ধরা না দিয়ে গভীর জঙ্গলে গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে শেখ মুজিব ‘বাঙালি হয়ে যাওয়ার’ পরামর্শ দেওয়ায় প্রতিবাদস্বরূপ পাহাড়িরা রাঙামাটি স্টেডিয়াম-সংলগ্ন শেখ মুজিবের জনসভা ত্যাগ করেছিলেন। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার মতো একজন সংসদ সদস্য সংসদ থেকে ওয়াক আউট করেছিলেন।
পাহাড়িদের আত্মোপলব্ধি, ভবিষ্যত করণীয় নির্ধারণ এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন জরুরি ও সময়ের দাবি রাখে। তা না হলে রাজনৈতিক দুরদর্শিতা এবং বিচক্ষণতার অভাবে পাহাড়ের মানুষ বারবার রাষ্ট্রের নীতির কাছে হেরে যাবে।
বর্তমান দুনিয়াজুড়ে মানুষের ব্যক্তিপূজা, সরলতা, স্বার্থপরতা ও চিন্তার অনগ্রসরতার কারণেই মীরের মতো ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা বারবার গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে বসেন। তখন তারা দেখিয়ে দিতে সক্ষম হন—‘তোমরা যতই বিরোধিতা করো, দেখো, আমরাই শেষ পর্যন্ত সবাইকে শাসন করছি।’
তবে এটাও ঠিক যে সমাজে সবাই এক নয়। এমন মানুষও আছেন, যারা ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে নিজেদের বিবেককে বিক্রি করেন না। জীবনের হাজারো কষ্ট, বেদনা ও অপূর্ণতাকে বুকে চেপে রেখে তাঁরা সামষ্টিক স্বার্থ ও মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করেন। নীতির প্রশ্নে কারও সঙ্গে আপোষ করেন না। নিজের স্বার্থ, আরাম-আয়েশ ও ব্যক্তিগত প্রাপ্তিকে বিসর্জন দিয়ে জাতির কল্যাণে, মানুষের মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁরা আজীবন কথা বলেন, সংগ্রাম করেন এবং লড়াই করে টিকে থাকেন।
আজকের দিনে সময়ের স্রোতে অনেকেই ক্ষমতার সঙ্গে নিজেদের রং বদলান। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন—যাঁরা সময়ের সঙ্গে নিজেদের বদলান না; বরং নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগ ও জীবন দিয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকেন। মানুষ তাদেরকেই স্মরণ করে, আর সুবিধাবাদী প্রতিক্রিয়াশীলরা ইতিহাসের আস্তাকুড়ে পড়ে থাকে।
আর মীর হেলাল সাহেব যতই সাপুড়ের মতো খেলা দেখাক, জনগণকে সর্বক্ষণ ভুলিয়ে রাখা যাবে না। খেলা দেখে বিনোদন হতে পারে, কিন্তু পেট ভরে না। দিন শেষে, খেলা শেষে তাদের বেঁচে থাকার, টিকে থাকার প্রশ্নটি মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। জমি, অধিকার ও অস্তিত্বের হিসেব নিকেশ কষতে থাকবে। আর যখন তারা দেখবে এই হিসেবের খাতায় এখনও বাকি পড়ে আছে, তখন তারা পাওনা আদায়ের জন্য মীর সাহেবদের মুখোমুখি হবে। এছাড়া তো আর তাদের কোন বিকল্প নেই।
* অমল ত্রিপুরা, সদস্য ইউপিডিএফ ও সাবেক সভাপতি পাাহড়ি ছাত্র পরিষদ।
লেখা ও ছবি লেখকের ফেসবুক পেইজ থেকে সংগৃহিত।