জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমার বিরুদ্ধে অভিযোগ জেএসএস সিনিয়র সহ-সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য গৌতম কুমার চাকমার অডিও রেকর্ড ফাঁস।
পিসিজেএসএস-এ চরম নেতৃত্ব সংকট: সন্তু লারমার বিরুদ্ধে জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রকাশ্য বিদ্রোহ, ভাঙনের মুখে সংগঠন
জ্যেষ্ঠ নেতা গৌতম কুমার চাকমার বিস্ফোরক বক্তব্য • শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে ভারতের মেঘালয়-আসামে ব্যবসা ও মাদক পাচারের অভিযোগ • চরম অনিশ্চয়তায় মাঠপর্যায়ের সশস্ত্র কর্মীরা
পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) ভেতরে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অসন্তোষ এবার প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতা সন্তু লারমার একচ্ছত্র নেতৃত্ব, আদর্শচ্যুতি এবং কতিপয় জুনিয়র নেতার লাগামহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছেন দলের সিংহভাগ জ্যেষ্ঠ নেতা। আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য ও জেএসএস-এর বর্ষীয়ান নেতা গৌতম কুমার চাকমার সাম্প্রতিক এক বিস্ফোরক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে এখন নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সংগঠনটির স্পষ্ট বিভক্তির চিত্র সামনে এসেছে।
সংগঠনটির ভেতরের নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করে তৈরি বিশেষ প্রতিবেদনটি নিচে তুলে ধরা হলো:
আদর্শচ্যুতি ও পারিবারিক কলহের বিস্ফোরক অভিযোগ
পিসিজেএসএস-এর অন্যতম নীতি নির্ধারক এবং আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য গৌতম কুমার চাকমা বর্তমান সভাপতি সন্তু লারমার বিরুদ্ধে সরাসরি নৈতিক ও আদর্শিক স্খলনের অভিযোগ এনেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বর্তমান নেতৃত্বকে ‘সামন্তবাদী ও প্রতিহিংসাপরায়ণ’ বলে আখ্যা দেন।
গৌতম কুমার চাকমা বলেন:
”আমার বিরুদ্ধে এটিই বুজ্যা (সন্তু) লারমার শেষ খেলা। তাঁর হাতে আর সময় নেই। যারা এম এন লারমার পথ অনুসরণ করে এবং জাতীয় ঐক্য, জাতীয় সংগ্রাম ও জাতীয় চেতনা চায়, তাঁদের দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতা এখন তাদের হাতে যারা বিভেদ ও বিভাজন চায়, যারা ক্ষমতার লোভী। এই নেতা অনেক আগেই আদর্শ বিসর্জন দিয়েছেন।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সন্তু লারমা কেবল রাজনৈতিকভাবেই দেউলিয়া হননি, বরং ব্যক্তিগত জীবনেও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে নিজের মেয়ে চিনছি ও জুলিয়ানা লারমার বৈবাহিক জীবন ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।
সন্তু লারমার বিপক্ষে একাট্টা জ্যেষ্ঠ নেতারা
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পিসিজেএসএস বর্তমানে মূলত দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে আছেন একাকী হয়ে পড়া সন্তু লারমা এবং তাঁর অনুগত অনুসারীরা, অন্যদিকে রয়েছেন দলের ত্যাগী ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের এক বিশাল অংশ।
গৌতম কুমার চাকমার নেতৃত্বাধীন এই বলয়ে সমর্থন জানিয়েছেন: ঊষাতন তালুকদার ও কে এস মং: দলীয় সূত্র জানায়, আসন্ন নির্বাচনগুলোতে জাতীয় সংসদের (MP) টিকিট না পাওয়ায় এবং সন্তু লারমার একনায়কতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে তারা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুব্ধ।
অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব: মঙ্গল কুমার চাকমা, শক্তিপদ ত্রিপুরা, যদুনাথ চাকমা এবং লক্ষ্মী প্রসাদ চাকমাসহ প্রায় সব শীর্ষ নেতা বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
জুনিয়র নেতাদের কোটি কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা
জ্যেষ্ঠ নেতাদের ক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ পিসিজেএসএস-এর দুই জুনিয়র নেতা—প্রণতি বিকাশ চাকমা এবং জ্যোতিস্মান চাকমা বুলবুল-এর আকস্মিক আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া। অভিযোগ রয়েছে, এই দুই নেতা সন্তু লারমার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে মাদক পাচারের সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন এবং এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
বর্তমানে ভারতের আসাম এবং মেঘালয় রাজ্যে এই দুই নেতার কোটি কোটি টাকার পাথরের ব্যবসা রয়েছে বলে জানা গেছে। জ্যেষ্ঠ নেতাদের অভিযোগ, যেখানে সাধারণ কর্মীরা জীবনের ঝুঁকিতে লড়ছেন, সেখানে এই নির্দিষ্ট চক্রটি নিজেদের এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ব্যস্ত।
মাঠপর্যায়ে তীব্র অসন্তোষ: অস্ত্র ছাড়ার গুঞ্জন
শীর্ষ নেতৃত্বের এই বিলাসী জীবন, অর্থপাচার এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের প্রভাব সরাসরি পড়েছে পাহাড়ে সক্রিয় জেএসএস-এর সশস্ত্র উইংয়ের ওপর। মাঠপর্যায়ে দিনরাত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা সাধারণ ‘সাম্য’ বা সশস্ত্র কর্মীরা এখন চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতারা যখন ভারতের নিরাপদ আশ্রয়ে কোটি টাকার ব্যবসা পরিচালনা করছেন, তখন সাধারণ কর্মীরা পাহাড়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাড়া খেয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। ফলে সাধারণ সশস্ত্র কর্মীদের মধ্যে এখন ‘তথাকথিত ধর্মযুদ্ধ’ বা সশস্ত্র পথ পরিহার করে নিজেদের সুরক্ষায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রবণতা তীব্র হচ্ছে।
পিসিজেএসএস-এর এই অভ্যন্তরীণ ফাটল পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও রাজনীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


