‘আগ্রাসনের শিকার নিরীহ শিশুদের আন্তর্জাতিক দিবস’ উপলক্ষে খুনী-ধর্ষক ও নরপশুদের ফাঁসি ও নারী শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবিতে রাঙামাটির কাউখালীতে সমাবেশ করেছে অগ্রণী শিশু-কিশোর কেন্দ্র (এসিসি), কাউখালী উপজেলা শাখা।
আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন ২০২৬) সকাল ১০টা সময় কাউখালীর বেতবুনিয়ার চাইঞোরি বাজারে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশের পূর্বে অংশগ্রহণকারী শিশু, কিশোর-কিশোরীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন ও শ্লোগানে বেতবুনিয়া কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ বিহারের গেট হতে মিছিল নিয়ে চাইঞোরি বাজারে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হন।
মিছিল পরবর্তী সমাবেশে এসিসি’র কাউখালী উপজেলা শাখার সাধারণ শিক্ষার্থী পামং মারমার সভাপতিত্বে ও সাধারণ শিক্ষার্থী চাইশিথুই মারমার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন, সাধারণ শিক্ষার্থী ইমন মারমা, দিপা চাকমা ও সিংসিং মারমা।
বক্তারা বলেন, আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ ও উত্তরসূরী যারা আমাদের ভবিষ্যতের উত্তরসূরী তারাই আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে। একজন শিশু হিসেবে যেভাবে স্বাধীনভাবে মুক্ত চিন্তা নিয়ে বেড়ে উঠার কথা কিন্তু তারা সেভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না।
তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ছোটকাল থেকেই শিশুদেরকে সেনাশাসন ও সেটলারের ভয়ে থাকতে হয়। আমরা প্রতিনিয়ত দেখি সেনা সেটলার কর্তৃক শিশু কিশোরী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। ৮০’র দশকের পর পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সেনা সেটলার কর্তৃক ডজনেরও অধিক গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। আমরা এখনোও এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার পাইনি।
বক্তারা বলেন, বিভিন্ন মিডিয়ার সূত্রের তথ্য অনুযায়ী বিএনপির সরকারের আমলে ৪ মাসের মধ্যে ১৩৭ জন নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, তার মধ্যে ৯১ জন শিশু। সারা দেশে এভাবে প্রতিনিয়ত ধর্ষণ, শিশু শ্রম, গৃহকর্মী নির্যাতন, খুন, অপহরণ ও শিশু পাচারের শিকার হচ্ছে। ঢাকায় রামিসা থেকে শুরু করে আছিয়া, কুমিল্লায় তনু, পাহাড়ে কৃত্তিকা ত্রিপুরা, চিংমা খেয়াং, তুমাচিং-সহ পাহাড় ও সমতলে অসংখ্য নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। কিন্তু এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হচ্ছে না। বছর দুয়েক আগে বান্দরবানে ভানথাংপুই বম নামে সেনাবাহিনী পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যা করেছিল। এ ঘটনার কোন বিচার এ রাষ্ট্র করেনি।
দীর্ঘ ১০ বছর পর কুমিল্লায় তনু ধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় জড়িতদের বিচারের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একজন অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনা হলেও পাহাড়ের ক্ষেত্রে ভিন্নতা প্রকাশ পায়। পাহাড়ে ধর্ষণ হলে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি ধর্ষকদেরকে আড়ালে রাখার চেষ্টা করে। তার স্পষ্ট প্রমাণ দেখতে পাই যে, গত ২৪ মে বান্দরবানে ৫ বছরের ত্রিপুরা শিশু ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে বিজিবি সদস্যদের অস্ত্র তাক করে বাধাদানের ঘটনা।
তারা বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ঢাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় অনেক শিশু শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত শিশু শিক্ষার্থী উক্য ছাইং মারমার বাবা সুষ্ঠু বিচারের জন্য আদালতে শরণাপন্ন হতে গিয়ে তাকেও পুলিশ-সেনাবাহিনীর হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে।
বান্দরবানে ২০২২ সাল হতে কেএনএফ দমনের নামে বম নারী-শিশুদের বিনাকারণে গ্রেফতার করে কারাগারে অন্তরীণ করা হয়েছে। নারীসহ অনেক বম নাগরিক এখনো কারাগারে বন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
বক্তারা বান্দরবানের আলীকদম ও লামা এলাকায় তিন শতাধিক শিশু হামে আক্রান্ত ও ৭ জন শিশু মারা গেছে উল্লেখ করে সারাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে ৬ শতাধিক শিশু মৃত্যুর ঘটনায় বর্তমান সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ি করেন এবং বলেন, সরকার শিশুদের সুরক্ষা ও সুচিকিৎসা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এ শিশু মৃত্যুর দায় সরকার এড়িয়ে যেতে পারে না।
বক্তারা বিশ্বে যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে ফিলিস্তিন, ইরান, ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশের শিশুরা আগ্রাসন ও হত্যার শিকার হচ্ছে উল্লেখ করে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের মাধ্যমে শিশুদের সুরক্ষা দেয়ার আহ্বান জানান। একই সাথে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন তুলে নিয়ে পাহাড়ের শিশুদের আগ্রাসনের কবল থেকে মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
সমাবেশ থেকে বক্তারা শিশু-নারী ধর্ষণ-হত্যাকারী নরপশুদের সর্বোচ্চ সাজা ফাঁসি প্রদান এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে নারী-শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।
সমাবেশে তারা “সেনা কর্তৃক দুর্বৃত্ত, ধর্ষক ও খুনীদের প্রশ্রয়দান বন্ধ কর; উদ্যত রাইফেল-বেয়নেট সরিয়ে নাও, আমাদের খেলতে দাও; আমরা ভয়-ভীতিহীন পরিবেশ চাই; স্কুলভবন সেনা ছাউনি বানানো চলবে না; প্রলোভনে শিশুদের ধর্মান্তর বন্ধ করতে হবে; End the conflict, save the children; Stop the silence, speak up for the children”… ইত্যাদি দাবি সম্বলিতে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।


