মাইকেল চাকমা
বইয়ের পর বই ঘেঁটে, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে, শত শত রেফারেন্স জুড়ে দিয়ে দীর্ঘ কথামালা রচনা করলেই গবেষণা হয় না। গবেষণার মূল কাজ হলো বাস্তবতাকে উন্মোচন করা, ক্ষমতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যকে মুক্তোর মতো তুলে নিয়ে আসা এবং সংকটের উৎস ও সমাধানের পথ চিহ্নিত করা। যে লেখালেখি কেবল রেফারেন্সের ভারে ন্যুব্জ, বাস্তব সত্যকে তুলে ধরতে ব্যর্থ; যে বিশ্লেষণ নিপীড়নের কাঠামোকে স্পর্শ করার সাহস রাখে না, তা গবেষণা নয়- সেটির নাম বুদ্ধিবৃত্তির আবর্জনা।
সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ নিয়ে শাসকগোষ্ঠীর খুদকুঁড়ো খেয়ে বেঁচে থাকা একজন কোট-টাইধারী গবেষক জ্ঞানগর্ব এক গল্প প্রসব করেছেন। তার লেখাতে দেশ-বিদেশের উদাহরণ, তত্ত্ব ও রেফারেন্স এমনভাবে সাজিয়েছেন যে দেখে মনে হতে পারে, তিনি গভীর কোনো সত্য উন্মোচন করেছেন। আসলে এর উদ্দেশ্য হলো, এসব দেখে যেন পাঠক অভিভূত হয়ে তার পাণ্ডিত্যের তারিফ করে! কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তব ক্ষমতা-কাঠামো, সামরিক কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া সেই লেখাটি কেবল একটি একাডেমিক আবর্জনা ছাড়া অন্যকিছু বিবেচিত হওয়ার যোগ্য নয়। সচেতনভাবে সত্যকে আড়াল করে ক্ষমতার ভাষ্যকে প্রতিষ্ঠা করার তার এই প্রচেষ্টা বুদ্ধিবৃত্তিক বেশ্যাবৃত্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।
পাহাড়ের প্রকৃত কাঠামোগত সামরিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তিনি একটি বাক্যও খরচ করেননি। বলেননি, কীভাবে সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তির বলয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। বলেননি, কীভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত সেনা-কর্তৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রণের অধীনে পরিচালিত হয়। বলেননি, কীভাবে পাহাড়ের জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও অধিকার বারবার রাষ্ট্রীয় শক্তির মুখোমুখি হয়। এসব মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে তিনি কেবল রেফারেন্সের পাহাড় দাঁড় করিয়েছেন, কিন্তু সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখানোর প্রয়োজন বোধ করেন নি!
এটাই তথাকথিত গবেষকদের বড় সংকট, কিংবা অজ্ঞতা। তারা সত্যের অনুসন্ধানী নন; বরং ক্ষমতার ভাষ্যকে বুদ্ধিবৃত্তিক মোড়কে বাজারজাত করার কারিগর। তারা বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ না করে বাস্তবতাকে আড়াল করার জন্য তত্ত্বের পর তত্ত্ব কপচান। তাদের এসব সারবস্তুহীন লেখালেখি অধিকারবঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে না গিয়ে বরং বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের মহান চিন্তক আহমদ ছফা এদের জন্যই “বিদ্যার ভারবাহী জন্তু” অভিধাটি ব্যবহার করেছিলেন। ফাইল ভর্তি সার্টিফিকেট, নামের আগে থাকা ডক্টেরেট পরিচয় কিংবা একাডেমিক পদবি- এসব তাদের শ্রেণিচরিত্রকে লুকাতে পারে না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো ক্ষমতার প্রতি তাদের আনুগত্যের সামাজিক স্বীকৃতি হিসেবে কাজ করে।


